আমি নই, মা গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন…

আনন্দক্ষণ মুহূর্ত

সবার জীবনে বাবা-মায়ের অবদান অপরিসীম, আমার ক্ষেত্রে বাবার পাশাপাশি মায়ের অবদানটা একটু বেশিই ছিল। ছোট বেলা থেকেই এই ব্যাপারটি দেখে বড় হয়েছি। দেখেছি মা কিভাবে একাকী সংসার এর হাল টেনে নিয়েছেন, কিভাবে চাকরির পাশাপাশি সংসার সামাল দিয়েছেন, কিভাবে দুই ছেলে কে মানুষ করার পেছনে একাকি যুদ্ধ করে গেছেন। বাবা (শরিফুল আলম চৌধুরী) ছিলেন পরিবারের ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট আর পরিবারের বড় সিদ্ধান্ত গুলো নেওয়ার ব্যাপারে, আর ছিলেন সাহসী উদ্যোগ গুলো নেয়ার ব্যাপারে এগিয়ে, বাবার কর্মক্ষেত্র দেশের বাহিরে (কুয়েতে) থাকার কারনে “মা” আমাদের সব কিছু দেখা শুনা করতেন, পরিবারের কখন কি লাগবে, কোথায় যাব, কি খাব, বেড়ানো ও দাওয়াত সহ ছেলে বেলার সব কিছু, কি করেননি তিনি, সংসারের যাবতীয় কাজের পাশাপাশি বাজার করা, রান্না-বান্না করা, নিজের বাসার কাজ গুলো নিজ দায়িত্বে করা, বাবার পরিবার যেমন দাদা, ফুফু সহ অন্যান্য যে/যারা আছে তাদেরকেও সাপোর্ট দেওয়া সহ নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব স্কুলে (শিক্ষক) দায়িত্ব পালন সহ সব কিছু।

আমি ও মা

আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি আমার মায়ের একাকী চলার সংগ্রাম। আমার বাবা দীর্ঘ ২৬ বছর কুয়েতে কাটিয়েছেন এর মাঝে দেশে কয়েকবার এসেছেন আবার গিয়েছেন, সার্বিক দিক বিবেচনা করলে এক কথায় মা আসলেই আমার জন্য এক অনুপ্রেরণা। আমার বাবা প্রায় সময়ই আমার “মা” কে বলতেন আমি আমার দুই ছেলেকে সম্পদ গড়ে দিব নাহ, তবে তোমার দুই ছেলেকে পড়া-শুনা করিয়ে মানুষ করে দিলেই ওরাই ওদের সব কিছু করে নিবে, এইটা নিয়ে ভেব নাহ। মা বলতেন পারবো তহ ! বাবা বলতেন চিন্তা কর নাহ, আল্লাহ্‌ ভরসা!

মা (সিনিয়র শিক্ষিকা, ১৩৭ নং উত্তর রাজাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়) আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন, এখনও কর্মরত আছেন। কিন্তু অবাক হলেও সত্যি মা প্রধান শিক্ষককে বলে রাখতেন আপনি মাংস রেখে দিবেন, আর হাড় গুলো আমাকে দিয়ে দিবেন। অর্থাৎ পড়া শুনার ক্ষেত্রে কোন ছাড় নাই। হাই স্কুলেও আম্মার দুলা ভাই ছিলেন আমাদের হেড মাস্টার, সেখানেও বলে এসেছিলেন একই কথা, কোন প্রকার ছাড় দেওয়া যাবে নাহ। কলেজে এসেও আমাদের তখনকার সময়ের প্রিন্সিফল ইকবাল স্যার (আম্মার রিলেটিভই ছিল) উনাকে বলে দিয়েছেন বকা ঝকায় কোন ছাড় না দেওয়ার জন্য। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যখন আসি ইউনিভার্সিটিতে (গণ বিশ্ববিদ্যালয়) এসেও আমাদের বিভাগীয় প্রধান ওয়াহিদা জামান লস্কর উনাকে বলে গেছেন কোন ছাড় নয়। শুধু মাত্র এমএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি) ডিগ্রীর ক্ষেত্রে এসে বিভাগীয় প্রধান বা কোন প্রফেসরকে কিছুই বলে যান নি। কেন জানি? বড় হয়েছি ভেবে নাকি অন্য কিছু? প্রশ্ন করবো কোন এক সময়?

ডানে আমি, মাঝে মা এবং মায়ের বাঁ পাশে আমার বড় ভাই

গত কাল আমার সাথে আমার মা ও আমার স্ত্রী এবং আমার বড় ভাই অংশগ্রহণ করেছিলেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় ৮তম সমাবর্তনে, গাউন আর ক্যাপ টি যখন পরিহিত অবস্থায় ছবি তুলছিলাম তখন এই ছোট্ট অর্জনটুকু মায়ের মাথায় আমি পরিয়ে দিয়ে বলি “মা আমি গ্র্যাজুয়েট হইনি, হয়েছ তুমি” এই সম্মান টুকু তোমারই এবং তুমিই প্রাপ্য।

বাবা ছিলেন অনুপ্রেরণার ভান্ডার, ২০১২ তে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন ওপারে, তবে ফোনে হলেও শিখিয়েছেন কিভাবে বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হয়, কিভাবে চলতে হয়, কিভাবে পরিশ্রম করতে হয়, কিভাবে নিজে কিছু করতে হয় আর ভাইয়ার উদাহরন দিতেন আমাকে সব সময়, দেখ হাছিব কিভাবে কাজ করছে, নিজে নিজে চলছে, নিজে নিজের ভার্সিটির টিউশন ফি এরেঞ্জ করছে, এই গুলোই আমাদের পরিবারের গল্প।

এই দিকে আমার বড় ভাই নুরুন্নবী চৌধুরী হাছিব (হেড অফ সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার, বাংলা ট্রিবিউন) আমার আরেক অনুপ্রেরণা নাম, সব সময়ই ওর কাছে শিখি, বাবা চলে যাওয়ার পর মায়ের পাশাপাশি ভাইয়াও আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মাসিক খরচ দিয়েছিল আমার মনে আছে, আমি মাসের শুরুতে চলে আসতাম প্রথম আলোতে, ও তখন প্রথম আলোতে ছিল, দুপুরে এখানে খেতাম আর বিল ভাইয়ার নামেই করতাম ক্যান্টিনে, তারপর ও এসে আমাকে মাসিক হাত খরচের টাকা দিত নিজের ইনকাম থেকেই আর বাসে যাওয়ার জন্য খুচরা কিছু দিয়ে দিত, আমি নিয়ে চলে যেতাম আর গিয়েই বাবাকে ও মা কে জানাতাম ভাইয়া আজকে টাকা দিয়েছে। বাবার বিদেশের মাটিতে পরিশ্রম ও ভাইয়ার ঢাকার সংগ্রামী জীবন আমাকে এতটা অনুপ্রাণিত করেছে যে, আমি পড়াশুনা থাকাকালীন সময়ে বিএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ বছরে নিজেই নিজের খরচ ম্যানেজ করেছিলাম। একটা কনফিডেন্স লেভেল বেড়ে গিয়েছিল নিজের মধ্যে।

শুধু তাই নাহ এরই মধ্যেই ঢাকায় একটি ছোট বাসা ভাড়া নিয়ে (৪ বছর) সংসার জীবন ও চাকরির পাশাপাশি এমএসসি পড়ার ৯০% এর উপর খরচ টুকুও নিজেই বহন করেছি চাকরি ও ফ্রিল্যান্সিং কাজের মাধ্যমে। ইভেন আল্লাহ্‌র রহমতে নিজের বিয়ের ৬০-৭০ % খরচও নিজেই বহন করেছিলাম এত কিছুর মাঝে। সব কিছুর জন্য শুকরিয়া মহান আল্লাহ্‌র কাছে। এই জন্য আমি আমার স্ত্রী ডাক্তার মাস্তুরাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই, সময় অসময়ে অনেক কিছুই বা শখ আল্লাদ পূরণ করতে না পারলেও কখনই এই সব নিজে টু শব্দ করেনি। আমাকে সহযোগিতা করেছে চলার পথে, সংসারিক নানান কাজে। গত কাল আমি আরও ২জন মানুষ কে মিস করেছি বিশেষ দিনে, এক মাত্র ভাবী নুসরাত জাহান ও চাচ্চু নুহানকে খুবই মিস করেছি।

বাঁ থেকে আমার মা, মাঝে আমি ও ডান পাশে আমার স্ত্রী

ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল পারিবারিক গল্প গুলো, লেখা হউক অনুপ্রেরণা ময় আর জীবন হউক আনন্দ ময়। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পৃথিবীর সকল বাবা ও মায়েদের প্রতি যে/যারা নিঃসাত্ব ভাবে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন নিজের জন্য নয় বরং সন্তানদের জন্য।

সব শেষে একটি কথা বলে শেষ করতে চাইঃ

“Love yourself & you will get a way how to live” – Asive Chowdhury

লেখক – আছিব চৌধুরী (জীবন থেকে নেয়া)

# মেডিসিন থেকে দূরে থাকুন – নিয়মিত শরীর চর্চা করুন এবং সুস্থ্য থাকুন #

আপনার যে কোন মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দিতে পারেন। পরবর্তীতে কি বিষয় নিয়ে লেখা চান সেটিও জানাতে পারেন ইমেইলের মাধ্যমে ।


Asive Chowdhury | Facebook | Twitter | LinkedIn | Google Site | Google Local Guides | Google Plus | YouTube

Google Site | Wikipedia | Instagram | Asive’s Blog

Email: ac.papon@gmail.com, Web: www.asive.