আমাদের বন্ধুত্ব, আমি আর নিলয় এবং আমাদের সার্কেল

 
সে অনেক দিন আগের কথা। আমি আছিব আর ওর নাম নিলয় কিন্তু এখন আমার নামের আগে ইঞ্জিনিয়ার পদবী আর ওর নামের আগে ডাক্তার, মানে ইঞ্জিনিয়ার আছিব চৌধুরী, ডাক্তার নিলয় দীপঙ্কর ঘোষ। কলেজ লাইফে পরিচয়, আমি গ্রাম ফরিদগঞ্জ থেকে মফস্বল শহরে চাঁদপুর এসেছি কলেজে ভর্তি হতে “চাঁদপুর সরকারী কলেজ” তখন কোন বন্ধু নাই, নতুন সব কিছু। তবে আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই ৩ মাস ফ্রি সময়ের মধ্যেই চাঁদপুরে চলে এসেছি, খালাম্মার বাসায় ছিলাম, কারন কম্পিউটারে ৩ মাসের প্রশিক্ষণ নিব বলে, সেখানে আমার সাথে প্রথম পরিচয় মাহমুদুল হাসান সাকী এখন পড়াশুনা করতে জার্মানি তে আছে ভাবী সহ, মূলত ওই আমাকে ওর অন্যান্য বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে বন্ধুদের সার্কেল হয়। কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেই অল্প অল্প নিলয়ের গল্প শুনেছি, তারপর কলেজে ভর্তি হওয়ার পর খুবই শুনলাম, খুবই পড়ুয়া এবং মেধাবী ছাত্র, কুমিল্লা বোর্ডে সেরা দশের প্রথম জন।
 
সারাদিন পড়া শুনা আর পড়াশুনা নিয়েই থাকে। খুব কম সময় বাহিরে কাটায় যত দূর জেনেছি শুধু মাত্র বিকেলে বন্ধুদের সাথে একটু সময় দেওয়ার জন্য বের হত তাও মনে হয় ১ ঘন্টা। ওর সাথে কার সূত্র ধরে পরিচয় আমি অনেকটা ভুলেই গেছি তবে ইচ্ছা ছিল ওর সাথে কথা বলবো, ওর সাথে মিশব, ওর গল্প শুনবো যে সবাই ওর গল্প করে একটু মিশে দেখি আমিও। সেই চিন্তা থেকেই ওর সাথে পরিচয় তারপর গল্প আড্ডা আর সময় কাটানো। ওর মা তখন আমাদের কলেজের কেমেস্ট্রির বিভাগীয় প্রধান ছিলেন, আর ওর বাবা আমাদেরই কলেজের মেথমেটিক্স বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন, ছোট বোনও খুব মেধাবী এখন ফরিদপুর মেডিকেলে পড়ে।
 
কিন্তু কখনও মনেই হয় নাই আমি মুসলিম আর হিন্দু, আমাদের মধ্যে সম্পর্ক টা এমন ছিল যে আমরা কখনও ধর্ম নিয়েই কথা বলতাম নাহ, ধর্ম যার যার। আমাদের মধ্যে ধীরে ধীরে খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়, আমরা প্রতিদিন হাঁটতে বের হতাম বিকেলে, হাসান আলীর মাঠ দিয়ে হাটা শুরু লেকের পাড়, মিশন রোড, ট্রাক রোড, বড় ষ্টেশন, ছায়াবানী মোড়, চাঁদপুর কলেজ, বাস স্ট্যান্ড, প্রফেসর পাড়া, চৌধুরী পাড়া, গনি রোড, ট্রেন ষ্টেশন, পাল পাড়া আরও অনেক জায়গার নামই ভুলে গেছি, আমরা হাঁটতাম আর গল্প করতাম এবং এটা আমাদের নিয়মিত আড্ডায় পরিনত হয়েছে। এভাবেই চলছিল আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আমি সব সময় বাসায় গিয়ে দেখতাম ও পড়তেছে, ওর বিছানার নিচে শুধু বই আর বই ছিল, আন্টি ও আংকেল একই বইয়ের অনেক গুলো সৌজন্য কপি পেত বলে ও অনেক বই পড়তে পারত।
 
আমি মাঝে মধ্যে ভাবতাম এত বই মানুষ পড়ে ক্যামনে অবশ্য ওকে কাছ থেকে না দেখলে আমার এই ধারণা সত্যিই হত না। অবশ্য এই জন্য ওর অনেক বন্ধু আমার উপর রাগও করেছে, আমারও অনেক বন্ধু রাগ হয়েছিল খালি নিলয়ের সাথে পড়ে থাকিস বেটা তুই কি ইত্যাদি, যাই হউক আমি এই সব কানে নেই নাই, আমার মনে হয় নিলয়ও কানে নে নাই, কেও আমাদের কারো ব্যাপারে কিছু বললে আমরা এই সব পাত্তাই দিতাম নাহ। অর্থাৎ আমরা আমাদের মতই চলতাম। তবে আমাদের একটা ভালো দিক ছিল আমরা খারাপ কোন আড্ডা আর বাজে কোন চিন্তায় সময় দিতাম নাহ। তারপর কিভাবে যেন আমাদের একটা সার্কেল হয়েও গেল, সুজানা, রিনী, মুন, আমি আর নিলয়, পরে পারিজাত মজুমদার (মেমী) ও যোগ দিয়েছিল আমাদের সার্কেলে, আমরা রিনিদের বাসার নিচে গলিতে প্রতিদিন আড্ডা দিতাম। কলেজ শেষে অথবা প্রাইভেট শেষে আমাদের নিয়মিত রুটিন ছিল আড্ডা দেওয়া, আমরা প্রায় সময় রিনিদের বাসায় ছাদে আড্ডা দিতাম আন্টি আমাদের খুবই পছন্দ করতেন। সুজানাদের বাসায়ও আমরা আড্ডা দিয়েছি, আন্টিও আমাদের খুবই আদর করতেন।
 
এভাবেই আমাদের একটা চমৎকার সার্কেল তৈরি হল, আমাদের নেত্রী রিনি খুবই দুরন্ত ছিল, সুজানা হাসি খুশি সব সময় ও ভালো মনের মানুষ, মুন চঞ্চল হলেও কিন্তু মনে হয় সব সময়ই চুপচাপ, মেমী হঠাৎ আমাদের চমৎকার বন্ধু হয়ে গেল, মেমী মাঝে মধ্যে ছুটিতে চাঁদপুরে আসতো ঢাকা থেকে কারন ও হলিক্রসে পড়ত, এমনও হয়েছে মেমী ঢাকা থেকে সরাসরি এসে আমাদের সাথে আড্ডায় যোগ দিয়েছে, আমি আর নিলয় চাঁদপুর সরকারী কলেজে আর রিনি, সুজানা, মুন চাঁদপুর মহিলা কলেজে পড়ত। তারপর হঠাৎ যখন রিনিরা চিটাগাং এ চলে গেল পুরো পরিবার নিয়ে সেই থেকেই আমাদের সার্কেল ভাঙ্গন শুরু হয়, কারন আমাদের সার্কেলের রিনি ছিল অনেকটা সর্দার এর মতন, হুটহাট করে কোন কিছু আয়োজন করা, আড্ডার প্লান করা, কোথাও যাওয়া, কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া, সাহস দেওয়া, আর বন্ধুত্ব কি জিনিস বুঝতে দেওয়া সবই রিনি করতো, আমরা ওর উপর অনেক ভরসা করতে পারতাম যে কোন ব্যাপারে। সত্যিই আমরা অনেক কস্ট পেয়েছিলাম এবং আমি আর নিলয় তো অনেকটা ভেঙ্গেই পড়েছিলাম যখন রিনি চলে গেল, রিনি যাওয়ার পড় সবাই সবার মত ব্যস্ত হয়ে গেল ইন্টারমেডিয়েট পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ও পরবর্তী জীবনের গল্প নিয়ে। দিন শেষে সব কিছুই মেনেই নিয়েই আমরা আমাদের জীবন এগিয়ে নিয়েছি। এই গল্প গুলো আজ থেকে ১১ বছর আগের গল্প প্রায় ১ যুগ হতে চলল। 
 
আজকে আমি ব্যায়াম করতে বের হয়েছিলাম সাইক্লিং করতে, কল্লানপুর রোড থেকে শ্যামলী হয়ে ৬০ ফিট বিজ্ঞান যাদুঘর, তালতলা, শেওড়া পাড়া দিয়ে আমি মিরপুর ১০ হয়ে ও ২ হয়ে বাসায় ফিরব প্ল্যান এমন সময় শেওড়া পাড়ায় একটু থামতেই পেছন থেকে নিলয় আমাকে তাপ্পড় দিয়ে বলে কই থেকে, সেই দেখা আর আড্ডা কখন যে ১ ঘন্টা হয়ে গেছে আমাদের মনেই নাই, গল্প শেষই হয় না, তারপর সৃতি চারন করতে গিয়ে আমরা ২০ মিনিটের মত হাঁটলাম আর কত সৃতি মনে করলাম। ওর সাথে প্রায় ৫-৬ বছর পর আমার দেখা। আমরা ঠিক আগের মতই আছি আমাদের বন্ধুত্বও আগের মতই আছে শুধু ব্যস্ততা আর বাস্তবতার খাতিরে আমাদের দেখাই হয় না। আমরা দারুণ সময় কাটিয়েছি ইন্টারমেডিয়েট লাইফে, যা আর কখনও ফিরে পাবো বলে মনে হয় না। সার্কেলের সবাইকে খুবই মিস করি কিন্তু কারো সাথেই আর দেখা হয় না, সবাই যার যার লাইফ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, সবাই জীবন যুদ্ধে নেমে গেছে, এই যুদ্ধ কখনই শেষ হবার নয়, এই যুদ্ধ চলমান। তাই দিন শেষে মন থেকে দোয়া করি সবাই সবার নিজ নিজ জায়গায় ভালো থাকুক আর ভালো করুক।
 
দেখতে দেখতে জীবনের অর্ধেক সময় পার করে ফেলেছি (গড় আয়ু অনুযায়ী) কত কিছু করা বাকি এখনও, আর কত কিছু করতে হবে, মনে হচ্ছে এখনও কিছুই করি নাই। আমি এখনও জীবনের মানে খুঁজে বেড়াই অনেক কাজের মাঝেও। আমাদের কাছে জীবনের সংজ্ঞা একটু ভিন্নই মনে হয়, গতানুগতিক জীবন আমার একদমই পছন্দ না আর হেলে পড়তে চাই না গতানুগতিক জীবনে। তবে একটা জিনিস মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতেছি স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল, আপাতত সব কিছুর মাঝে একটু স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়েই ভাবছি এবং অন্যদের উৎসাহ দিচ্ছি, এর কোন বিকল্প নেই। ভালো থাকিস নিলয়, সুন্দর হউক তোর জীবন, সফলতা বয়ে আসুক তোর এই প্রত্যাশা সব সময়। আজ অনেক কিছুই মনে পড়ে গেল তাই লিখতেই বসে গেলাম। জানি না এই সৃতি গুলো ভুলে যাব কবে তাই লিখে রাখলাম সৃতি ধরে রাখার জন্য। আশা করছি তুইও কিছুই ভুলিস নাই আর আমাদের বন্ধুত্ব আগের মতই আছে এবং থাকবে। আর তোরা যে যেখানে আছিস আল্লাহ্‌ তোদের ও তোদের পরিবারকে ভালো রাখুক এই প্রত্যাশা।
 
– জীবন থেকে নেওয়া। 

আপনার যে কোন মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দিতে পারেন। পরবর্তীতে কি বিষয় নিয়ে লেখা চান সেটিও জানাতে পারেন।

Asive Chowdhury | Facebook | Twitter | LinkedIn | Google Site | Google Local Guides | Google Plus | YouTube

Google Site | Wikipedia | Instagram | Asive’s Blog

Email: ac.papon@gmail.com, Website: www.asive.me