আমাদের লকডাউন ঈদ ২০২০

রাতেই নানান রান্নার নানান প্ল্যান ডাক্তার মাস্তুরা কাস্মীরীর (আমার স্ত্রী), কি কি করবে ঈদের আগের দিন থেকেই প্রস্তুতি, ইউটিউবে রান্নার প্রশিক্ষণ, নিজের জানা সব মিলিয়ে বাজারের লিস্ট আমাকে ২-৩ দিন আগেই ধরিয়ে দিয়েছে, করোনা কালে বাজারে গিয়ে বাজার করা কঠিন তাই চাল ডাল ও বেচা কেনা সহ অন্যান্য ইকমার্স এর হেল্প নিলাম, আবার বাসার কাছে সুপার শপ গ্রেসও গিয়েছিলাম টুকিটাকি কেনার জন্য, যাই হউক অবশেষে টুকটাক বাজার করা হল লিস্ট অনুযায়ী, যদিও এই ঈদে আমাদের ধুমধাম কোন আনন্দ, ছবি তোলা, কারও বাসায় যাওয়া আসা সবই আমাদের চিন্তার বাহিরে ছিল কারন একটাই করোনা ভাইরাস ও সচেতনতা। বেঁচে থাকলে আরও ঈদ করা যাবে আনন্দ নিয়ে।

রাতেই বলেছি সকালেই ডেকে দিও, ঈদের নামাজ বাসায় আদায় করবো, সেই অনুযায়ী সকালে উঠলাম ফ্রেশ হয়ে অজু করে নামাজে দাড়িয়ে গেলাম সকাল ৯ টার আগেই, ততক্ষণে কাস্মীরী কিচেনে সকালে মিষ্টি মুখের জন্য সেমাই ও সকালের নাস্তার জন্য পরোটা এবং আলুর দম করছিল। আমি নামাজে দাঁড়ানোর আগে একটি দেখে নিলাম বাসায় ঈদের নামাজের আদায়ের নিয়ম গুলো, এই যুগে মোবাইল ও ইন্টারনেট আর গুগোল ও ইউটিউব থাকলে আসলেই জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়। তবে তথ্য অবশ্যই বিশ্বস্ত সোর্স দেখে নেওয়াই উত্তম। নামাজ আদায় করলাম, টিভি ছাড়লাম খবর দেখার জন্য এর মধ্যেই কাস্মীরী নাস্তা নিয়ে হাজির, আমিও টুকটাক হেল্প করলাম প্লেট, বাটি ও গ্লাস গুলো ধোঁয়া মোছার কাজে। তারপর ২জনেই নাস্তা করতে বসলাম, নাস্তা শেষে ও আবার রান্না ঘরে, আগের প্ল্যান অনুযায়ী যেহেতু বাসার বাহিরে যাচ্ছি না, তাই ছোট করে ঈদের আনন্দটুকু একটু রান্না বান্নায় বা খাবারেই রাখি, আমিও না করলাম না। পলাউ, ডিমের কোর্মা, মুরগীর রোস্ট, ঝাল মুরগি মাংস, বোরহানি, দই আবার রসগোল্লাও এত কিছু করে বসে আছে আমি নিজেই জানতাম না। কিছু রান্না আগের রাতেই করে রেখেছে আর বাকি গুলো সকালে, ওমনি আমি নাস্তা করেই ক্লান্তি লাগছে, কেননা টানা এক মাস সিয়াম (রোজা) করার পর হঠাৎ সকালে নাস্তা কেমন জানি লাগছিল বলছিলাম কাস্মীরীকে।

বলতে বলতে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, আর এর মধ্যে ও রান্না বান্না করতে করতে প্রায় ২টা বেজে গেল, আমাকে এসে ডাকল, ঘুম থেকে উঠতেই নাকে পলাউর ঘ্রান, আড়ং এর ঘি এনে দিয়েছিলাম বাজার থেকে। ফ্রেশ হলাম ও যোহরের নামাজ আদায় করলাম, আর ওপাশ থেকে বলল সালাদ তোমাকে বানাতে হবে, আমিও যথারীতি কাটাকাটি শুরু করলাম শসা, টমেটো, কাঁচা মরিচ, ধনে পাতা, পুদিনা পাতা সাথে একটু বিট লবন ইতিমধ্যে কাস্মীরীও ফ্রেশ হয়ে আসলো ডাইনিং এ বসে একসঙ্গে খাব বলে। সালাদও রেডি বসে পড়লাম দুজন আর আলাপ করছিলাম প্রতি ঈদে আমরা হাছিব ভাইয়ার (আমার একমাত্র বড় ভাই) বাসায় এবং কাস্মীরীদের বাসায় (শশুর বাড়ি) যাই আর এবার সবাই সবার ঘরে কেও কোথাও মুভ করছি না করোনার কারনে, বলতে বলতে খাওয়া শুরু পলাউ, মুরগি রোস্ট আর সালাদ একই সাথে আমরা বোরহানিও রেডি করলাম কারন উপকরন গুলো সবই কাছাকাছি ছিল বা আগে থেকেই রেডি ছিল। গল্পে গল্পে খাওয়া শেষ করে দুজন মিলে একটু রেস্ট নিতে নিতে একটি সিনেমা দেখলাম “থাপড” নামে নতুন সিনেমা ২০২০ সালেই রিলিজ হয়েছে হিন্দি খুবই অসাধারণ একটি সিনেমা বাস্তব কাহিনী নিয়ে, সংসার জীবন এর বাস্তবতা, স্বামী ও স্ত্রীর প্রতিদিন, বাবা ও মেয়ের ভালোবাসা ইত্যাদি নানান বিষয় উঠে এসেছে, খুবই উপভোগ করলাম দুজনে আবার মাঝে মধ্যে অতিরিক্ত ইমোশনে দুজনেই কেঁদেও দিয়েছি, এর মধ্যে আসরের আযান, মুভি পজ করে ঘুম ভাব কাটানোর জন্য আমি চা করলাম আর আসরের নামাজ আদায় করলাম, তারপর আবার চা নিয়ে পুনরায় মুভি দেখা শুরু করলাম।

প্রায় মাগরিব ঘনিয়ে এল, মুভিও শেষ হল, উঠে অজু করে মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম। এমন সময় কাস্মীরী বলল চটপটি খাবা, রেডি করা আছে গরম করতে হবে, যেই কথা সেই কাজ চটপটি আর পুচকাও রেডি করল, আমি নামাজ শেষে বসলাম টিভিতে খবর দেখতে দেখতে এই পর্বও শেষ করলাম। এমন সময় শাশুড়ি আম্মা ফোন দিয়েছে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় হল, ভাবী ও রাফির সাথেও কথা হল। আর আগের রাতে নুহান ও নুসরাত ভাবীর সাথে সাথেও শুভেচ্ছা বিনিময় হল। আর সকালে ঈদের নামাজ শেষে আম্মার সাথে কথা বললাম ২ জনেই, আমি একটু কাজে বসলাম ল্যাপটপে আর টুকটাক সোশ্যাল মিডিয়াতে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম, যা আগের রাত থেকেই অল্প অল্প করে করছিলাম, আর কাস্মীরী নিজের মত কিছু কাজ করলো, তারপর এশার নামাজ আদায় করলাম দুজনে গল্প করার জন্য বসলাম অনেক দিন পর, আর গল্প করতে করতে প্রায় রাত ৩ টা বেজে গেল, আমরা রাতের খাবারের জন্য রেডি, যা রান্না ছিল তা নিয়েই আমরা খাবার খেতে বসলাম।

অনেক দিন পর আমরা অনেক অনেক গল্প করলাম, জীবনের গল্প, গত ৬ বছর সংসার জীবনের গল্প, আমাদের ভাবনা, আমাদের চিন্তা ভাবনা, আমাদের পথ চলা সহ নানান সৃতিচারন একই সাথে সামনের দিন গুলো কেমন হবে, কিভাবে এগিয়ে যাব এই সব তো আছেই। গল্পে গল্পে রাতের খাবার শেষে কাস্মীরী চলে গেল বই পড়তে আমি বসে পড়লাম আজকের এই চমৎকার দিনটি নিয়ে লিখতে, জানি এমন দিন সব সময় আসবে না, তবে এমন দিনের আনন্দ ও ভালো লাগা হয়তো সামনের দিন গুলো আরও আনন্দময় করতে উৎসাহ দিবে। আমরা একটা জিনিস ফাইনালি আবিস্কার করলাম আমাদের প্ল্যান অনুযায়ী আমরা নিজেরাও কোন ছবি তুলি নাই বা খাবারের কোন ছবিও তুলি নাই বা সোশ্যাল মিডিয়াতেও শেয়ার করি নাই, কেন না এমন কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদেরকে স্বাভাবিক রাখতে যত টুকু চেষ্টা কাস্মীরী করেছে এই জন্য ওর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আর যত টুকু আমরা এড়িয়ে চলেছি অনেক কঠিন অবস্থায় থাকা মানুষ গুলোর জন্য তার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে কৃতজ্ঞতা তিনি আমাদের বিবেক দিয়েছেন।

আর হ্যাঁ আমাদের বাসায় যে সহযোগিতা করে ওর নাম “নাজমা” ঈদের আগের দিন এসেছে অনেক দিন পর, কাশ্মীরীকে বেশ সাহায্যও করলো বাসার কাজে আর আমরা রমজানের শেষ ইফতার তিন জন মিলে একসাথেই করলাম, মহান আল্লাহ্‌র কাছে এই জন্য শুকরিয়া, বেতনও লাগবে যদিও টানা এক থেকে দেড় মাস বাসায় কাজে আসেনি, আমরাই না করেছি এমন কঠিন পরিস্থিতিতে বাসায় না আস্তে বা বাহিরে কোথাও না যেতে, আমরাও বলেছি এটা বৈশ্বিক সমস্যা আমাদের একার নয়, আমরা তোমার বেতন পুরোটাই দিব আল্লাহ্‌ আমাদের সুস্থ্য রাখলে, আল্লাহ্‌র অশেষ মেহেরবানীতে ওর বেতন পুরোটাই দিয়ে দিয়েছি আর আল্লাহকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি সকল কিছুর জন্য, আল্লাহ্‌ সবাইকে এমন ভয়াবহ করোনার মহামারী থেকে সমগ্র মানব জাতিকেও রক্ষা করবেন, ইনশাল্লাহ। তাই ঘরে থাকুন, নিরাপদ থাকুন এবং পরিবারের সবাইকে নিরাপদে রাখুন, লিখতে লিখতে ফজরের আযান পড়ে গেল, যাই নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়ি…আবারো সবাইকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়ে ছোট্ট টোনাটুনির সংসার এখানেই বিদায় নিচ্ছি, আল্লাহ্‌ হাফেজ।


লেখক ও গবেষক – প্রকৌশলী আছিব চৌধুরী

“Love yourself & you will get a way how to live” – Asive Chowdhury

# মেডিসিন থেকে দূরে থাকুন, নিয়মিত শরীর চর্চা করুন এবং সুস্থ্য থাকুন #

আপনার যে কোন মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দিতে পারেন। পরবর্তীতে কি বিষয় নিয়ে লেখা চান সেটিও জানাতে পারেন ইমেইলের মাধ্যমে (asive.me@gmail.com)

My Research Publication in International Journal | About Asive Chowdhury Learn with Asive | Facebook | Twitter | LinkedIn | Instagram | Blog Spot YouTube | BudgerigarsWiki

I am a Google Local Guide | Wikipedia | Asive’s Blog

I am in Flicker | I am in Google Maps | I am in wikipedia Commons |I am a Designer | I am in Google Site

Email: asive.me@gmail.com, Web: asive.me