ওদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বটাও আমাদেরই

ওদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বটাও আমাদেরই…রাত ২টা, হঠাৎ টিভি দেখতে দেখতে ফেইসবুকে ডু মারা, যে বন্ধুটিকে খুব কম সময়ই আমি এই সময় অনলাইনে দেখি তাকে হঠাৎ দেখা ! কিরে কোন সমস্যা? তুই এত রাতে ? এমন একটি ম্যাসেজ ছিল আমার পক্ষ থেকে…সাথে সাথে বলল দোস্ত আমি কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ডে বসে আছি, গত কয়েকদিন আগে কথা হয়েছিল বলল আমি “০৬০৮ উদ্যোক্তা হাব” আড্ডায় যোগ দিব আগে বাগেরহাট থেকে ঘুরে আসি…যাই হউক আমি ম্যাসেজ দেখে ভাবলাম গ্রামে যাবে মনে হয় বা বাসে উঠবে, একটু পর বলে দোস্ত বাস আগেই নামিয়ে দিয়েছে। আমি ঢাকায় এসেছি আজকে, এখন পাম্পে বসে আছি। বললাম মানে ?


সিলভিয়া (বন্ধুটির নাম) ঢাকায় বাড্ডায় থাকে ব্যাচেলর, দেশের বাড়ি বাগেরহাট, পরিবার ঢাকার বাহিরে থাকে, পড়াশুনা শেষ করে জব করে একটি স্বনামধন্য মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে আর একই সাথে নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা যোদ্ধা হিসাবে গড়ে তুলতে চায়। যার জন্য চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা যুদ্ধ শুরুও করে দিয়েছে ফ্যাশন আইটেম নিয়ে, চাকরি, পড়াশুনা, উদ্যোক্তা জীবন সব কিছু মিলিয়ে হিমশিম তাও চালিয়ে যাচ্ছে যুদ্ধ। যাই হউক বললাম তুই বাসায় যা ! বাসা থেকে কেও আসে নাই, আপন জন কেও তোকে রিসিভ করার জন্য এত রাতে ? না হলে উবার ডাক ! এখানে বসে থাকার দরকার কি ! বলল আরও যাত্রী আছে অসুবিধা নাই। আর উবার সেইফ ফিল করছি না…


বললাম ওকে সাবধানে থাক এবং বাসায় জানা। একটু পর ম্যাসেজ দোস্ত অন্য যাত্রী গুলো এক এক করে চলে যাচ্ছে, আমার কেমন যেন লাগতেছে ! আমি বললাম তুই উবার ডাকিস না আমি ডেকে দিচ্ছি এবং আমি ফলোআপ করবো অসুবিধা নাই। তাও বলছে নারে উবারে রাত ২-৩ টায় ভয় করতেছে, আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম এত রাতে বাসায় যাবি গেইট খুলবে তহ। অসুবিধা নাই তহ…বলল না বাসায় গেট খুলবে ঐটা অসুবিধা নাই। তাইলে তুই কি করবি, বলে ওয়েট করি সকাল হলে চলে যাব। আচ্ছা ঠিক আছে, সাবধানে থাকিস। কিছুক্ষণ পর ম্যাসেজ দোস্ত আমি একা হয়ে গেছি আমার ভয় লাগতেছে, সবাই মুটামুটি চলে গেছে, এখন পেট্রোল পাম্পে ৪-৫ জন ট্রাক / লরি ড্রাইভার আছে। আমার ঠিক কি করা উচিৎ বুঝতে পারছি না, উবার কল করার সাহস পাচ্ছি না, মোবাইলে টাকা শেষ প্রায়, ডাটাও তেমন নাই, ফ্রি মেসেঞ্জার ইউজ করতেছি, চার্জও শেষ প্রায়, বিকাশে টাকা আছে কিন্তু লোড করতে পারছি না ডাটা নাই। আমি সাহস পাচ্ছি না উবারে।


এই ম্যাসেজ দেখার পর তো আমি আসলেই বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিৎ ঐ মুহূর্তে আমার, জাস্ট একটু চিন্তা করলাম, যে ওর নিরাপত্তাটা জরুরী, আগে ওরে সেইফ ফিল করাতে হবে, কল দিলাম বললাম তুই কানেক্ট থাক আমার সাথে, দেখি কি করা যায়। স্ত্রী ঘুমিয়ে গেছে, আমার বাসায় ৩ টা গেট এবং রাতে কিছু এক্সট্রা লক করা হয় যার চাবি কারও কাছে থাকে না। ঝটপট রেডি হলাম রাত তখন ৩ টা, জানি না কিভাবে কি করবো, উবার কল দিলাম নাই, অনেক দূরে আর রাস্তায় কিছু পাব না শিউর ছিলাম, সবচেয়ে বড় সমস্যা নিচের গেট, উপরের গেট কিভাবে খোলার ব্যবস্থা করবো জানি না। স্ত্রীকেও নক দিলাম না, আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে বের হয়ে গেলাম যে মেয়েটা সেফ করতে হবে, বর্তমান পরিস্থিতি ভালো নয়। আমার মাথায় আর কিছু নাই…বের হয়ে দরজা লক করে বাড়িওয়ালার বাসায় খালাকে রিকুয়েস্ট করলাম, ঘুম ভাঙ্গিয়ে মোট ৩ টা গেট ওপেন করালাম রাত ৩ টার দিকে, বেচারা কে কষ্টই দিলাম।


বের হয়ে উবার নাই, রিক্সা নাই, হাটা শুরু করলাম, ওরে ফোন দিচ্ছি এর মধ্যে তুই ঠিক আছিস কিনা ! কি করছিস কে কে আছে, অবস্থান কই ইত্যাদি। ১৫ – ২০ মিনিট হেঁটে রিক্সা পেলাম একটা ডাক দিয়ে গেলাম কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ডে, ইতিমধ্যে ওরে বলি নাই যে আমি আসতেছি, সে আবার একটা উবার কল করেছে কিন্তু সাহস পাচ্ছে না আমাকে বলেতেছে, আবার বলতেছে পেট্রোল পাম্পে এর পরিস্থিতি থেকে অন্তত উবার ডাকাই ভালো, কি করার ! বললাম তুই থাম, আমি কাছাকাছি আমি আসতেছি তোকে পিক করার জন্য, ও বিশ্বাসই করতেছে না। যাই হউক গেলাম অনেক এই দিক সেই দিক করার পর যেখান থেকে ওরে রিসিভ করলাম যে পাম্পে সেখানের পরিস্থিতি ভয়াবহ। যাক গিয়েই রিক্সায় তুলে নিলাম তারপর বললাম বাসায় চল, সকাল হউক তারপর দেখা যাবে।


বাসায় নিয়ে আসলাম তখন রাত ৪ টা বাজে, বাসায় ডুকলাম। বললাম বাসায় ফোন দে বল যে তুই পৌঁছেছিস। ওরে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে আমি ঘুমাতে গেলাম, স্ত্রী হঠাৎ জেগে ! কি ব্যাপার আছিব কোন সমস্যা ! বললাম হ্যাঁ একজন মেয়ে বন্ধু বিপদে পড়েছে, আমি মাত্র গিয়ে নিয়ে আসলাম। খুব কঠিন বিপদ ভেবেই আমি বেড়িয়ে পড়েছিলাম তোমাকে না জাগিয়ে। আসলে কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না, বলল কি ০৬০৮ এর, বললাম হ্যাঁ। আজকেই প্রথম দেখা, জানা শোনা আগেই। ওর অবস্থান ভালো ছিল না তাই ওকে নিয়ে এসেছি, তুমি ঘুমাও।


আমার স্ত্রী শুধু আমার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, তুমি করেছে আশা করছি ভেবেই করেছ। এইত সকালে ঘুম থেকে উঠলাম, সিল্ভিয়া (এসএসসি ০৬ এইচএসসি ০৮) কে সকালে ঘুম থেকে ডাকলাম, আমি একটু চা করলাম আর বিস্কিট দিলাম, সকালে ৩ জনে হালকা নাস্তা সেরেই বের হয়ে গেলাম যে যার গন্তব্যে। আমার স্ত্রী ডাক্তার মাস্তুরা কাস্মীরী আজকে বনানীর কড়াইল বস্তীতে প্রকল্পের ভিজিটে গিয়েছিল “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) এর প্যালিয়েটিভ মেডিসিন” বিভাগের একটি প্রকল্প সেখানে (বনানী কড়াইল বস্তী) চলমান ক্যান্সার আক্রান্ত রুগীদের নিয়ে কাজ, সপ্তাহে ১ দিন সেখানে মেডিকেল কন্সালটেন্স হিসাবে ভিজিট করে। আজকেই ছিল সেই ডিউটি, বললাম সিলভিয়ার সাথে একসাথেই যাও, সিএনজি করে দিলাম সিল্ভিয়ার অফিস গুলশান আর আমার স্ত্রী তো পথেই নেমে নামবে…এই তো…

এটা সিনেমা নয়, গত কাল রাতের ঘটনা, আমার জীবনের ঘটে যাওয়া অন্যতম ঘটনা গুলোর মধ্যে একটি। সিল্ভিয়া খ্রিষ্টান ধর্মালম্বী। ও শুধু একটা কথাই বলছিল যে ঈশ্বর হয়তো সব কিছু করে রেখেছেন এমন একটি ঘটনা ঘটবে যা গত ৫-৬ বছর আমার ঢাকা আসা যাওয়ার পথে এমন হয়নি। আর আমি শুধু মনে মনে ভেবেছি একটি মা/বোন/বন্ধুর/মেয়ের/স্বপ্নের নিরাপত্তা আমি দিতে পেরেছি, এই শহরে এই দায়িত্ব টুকু পালন করার মানুষ কমে গেছে, আসলেই কমে গেছে সবাই নিজেকেই নিয়ে ভাবে আর দিন শেষে প্রতিদিন পত্রিকা ধর্ষকের নিউজ পড়ে চোখের ব্রু কুঁচকে আহা, ইস করে ভুলে যাই। আবার নতুন নিউজের খবর পড়ে স্ট্যাটাস শেয়ার করি, মন খারাপ করি আর কি !

মনে হয় সময় এসেছে সবাই সবার জায়গা থেকে ওদের (মেয়েদের) পাশে দাঁড়ান, ওদের সাহস দিন, ওরা একা না ওদের পাশে আমরা আছি এই বার্তা টকু দিয়ে দিলেই হবে, বাকীটা ওরা করে নিবে আর আপনাকে করে দেখাবে। ভালো থাকুক বন্ধুত্ব, ভালো থাকুক পৃথিবীর মানুষ গুলো, ভালো থাকুক সমাজের চিন্তা ভাবনা গুলো আর ভালো থাকুক “০৬০৮ উদ্যোক্তা হাব” জয়তু ০৬০৮


নোটঃ এই কাজটি সহজ নয়, চিন্তা ভাবনা করে করবেন। বিশ্বাস রাখবেন, সংসারের কথাও মাথায় রাখবেন, সবাই ভালো ভাবে নাও নিতে পারে, আপনার স্ত্রী বা সন্তানের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন। আপনি যাই করুন না কেন, যাতে আপনার পরিবার বা আপনার স্ত্রী আপনার উপর আস্তা না হারান। আমি ভেবেছি এমন পরিস্থিতিতে যদি আমার স্ত্রী পড়ত বা আমার মা বোন যে কেও ! হয়তো তখন কেও এমন ভাবেই ভাববে, এমন ভাবেই এগিয়ে আসবে আর পাশে দাড়াবে বা কেও আসবেই না তাতে কি ! আমি তো আমার কাজ টুকু করেছি। আপনি আপনার দায়িত্ব টুকুই পালন করুন আর এমন পরিস্থিতির জন্য সব সময় নিজেকে প্রস্তুত রাখুন।

আর নিজের নিরাপত্তা নিয়েও ভাববেন, এভাবে ফাঁদও হতে পারে খুবই সাবধান সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে। আর বন্ধু / বান্ধবী নিজেরা এমন পরিস্থিতিতে পড়ার আগে সেটাকে কিভাবে ট্রেকেল দেওয়া যায় ভাবতে হবে, বিএফ – জিএফ, বন্ধু বান্ধব আর আপনজন এমন সময়ে কাছে চাই, না হলে এইসবের দরকার নাই ! নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই ঠিক করতে হবে, জীবন সঙ্গী যেমন বিশ্বাসী হতে হবে ঠিক তেমনি বিপদে কাছে বা পাশে পেতে হবে তাহলেই ভালোবাসার সার্থকতা মিলবে।

আমি আজ খুবই খুশি, আল্লাহ্‌ আমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন, আমার জীবনের আরও একটি বড় অর্জন এটি যা অনেকের কাছে হাসি বা ঠাট্টা মনে হবে বা পাগলামিই মনে হবে, হ্যাঁ এমনটাই হয়েছে আমার সাথে গত কাল ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২০ রাতে…সৃতির পাতায় থেকে গেল এই বাস্তব গল্পটি…..
আল্লাহ্‌ সবাইকে নিরাপদে রাখুক, এটাই প্রত্যাশা…


লেখক ও গবেষক – প্রকৌশলী আছিব চৌধুরী

“Love yourself & you will get a way how to live” – Asive Chowdhury

# মেডিসিন থেকে দূরে থাকুন, নিয়মিত শরীর চর্চা করুন এবং সুস্থ্য থাকুন #

আপনার যে কোন মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দিতে পারেন। পরবর্তীতে কি বিষয় নিয়ে লেখা চান সেটিও জানাতে পারেন ইমেইলের মাধ্যমে (asive.me@gmail.com)

My Research Publication in International Journal | About Asive Chowdhury Learn with Asive | Facebook | Twitter | LinkedIn | Instagram | Blog Spot YouTube | BudgerigarsWiki

I am a Google Local Guide | Wikipedia | Asive’s Blog

I am in Flicker | I am in Google Maps | I am in wikipedia Commons |I am a Designer | I am in Google Site

Email: asive.me@gmail.com, Web: asive.me